চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রসঙ্গেঃ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা মূল ক্যাম্পাসে কেন ফিরে যাবে?

আবু নাসের রবি

\"\"

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র হিসেব চারুকলা ইন্সটিটিউটের চলমান সংকট সম্পর্কে বেশ কিছুদিন ধরে খবর রাখছিলাম। খেয়াল করলাম বর্তমান শিক্ষার্থীদের ২২ দফা দাবী এবং শেষে একদফায় চারুকলা ইন্সটিউটকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেবার দাবী তে গিয়ে ঠেকেছে। ২২ দফা দাবী আমি মনোযোগ সহকারে পড়েছি, এই দাবী গুলির বেশিরভাগের সাথে আমি একমত, কেননা একজন চারুশিক্ষার্থীর চর্চা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে যেই সব মৌলিক অবকাঠামো দরকার তাঁর যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে তার ব্যবস্থা করার দাবী করা যৌক্তিক। কিন্তু এসব সমাধান তো যেই পরিসরে চারুকলা ইন্সটিটিউট আছে সেখানে থেকেই করা যায়, তাঁর জন্যে জোরদার আন্দোলন করা উচিত। কিন্তু এই সব অসন্তোষ ও অপ্রাপ্তির অজুহাত তুলে দীর্ঘদিন আগে মীমাংসিত একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসে আদতে মূল সমস্যা মাধানের জন্য শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক চাওয়া গুলিকে উপেক্ষা করে ইন্সটিটিউট কে পুনরয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেবার আন্দোলন কেন তা বুঝা মুশকিল। এই আন্দোলনের ১ দফায় পরিণত হওয়ার বিষয়টি কারো ঘোলাজলে মাছ শিকারের চেষ্টা মনে হয়েছে।

বলা হচ্ছে চারুকলা ইন্সটিটিউট কে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নিলে ছাত্রছাত্রীদের সব অভাব অভিযোগ মিঠে যাবে। আসলে কি তাই হবে? এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কোন আনুষ্ঠানিক মতামত দেয়নি এখনো।

চট্টগ্রামের একজন চারুশিল্প চর্চাকারী হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে চারুশিক্ষা সম্পন্ন করে আসার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। তাঁর প্রেক্ষিতে এই আন্দোলনকারী নবীনদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা লিখে রাখছি এখানে। তাদের কোমল আবেগ আর কিছু উদ্দেশ্য তাড়িত সিনিয়রের উস্কানির সাথে এই অভিজ্ঞতা গুলির যৌক্তিক তুলনা আশাকরি তারা করতে সক্ষম হবেন।

আমার চারুকলা বিষয়ে পড়াশুনার প্রাতিষ্ঠানিক সুত্রপাত হয় ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তির মাধ্যমে। সে বছর চারুকলা বিভাগে একটা বার্ষিক প্রদর্শনী হয়। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেব আমি তাতে অংশগ্রহনের সুযোগ পাই। ২০০৩ সালে আমার চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে এই অভিযাত্রার সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এই দীর্ঘ ৮ বছরে আর কোন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়নি আমাদের বিভাগের উদ্দ্যোগে। পাশ করে শহরে যখন স্বাধীন চর্চা শুরু করি তখন সঙ্গত কারনেই নিজের সিভি লিখতে গিয়ে খেয়াল করলাম যে, ভিজুয়াল আর্টের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রদর্শনীর অভিজ্ঞতা আমার যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে এখন গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য হচ্ছে । কিন্তু নানা কারনে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে নিজের শিক্ষাকালে আমার ডিপার্ট্মেন্ট সেই সুযোগ তৈরি করতে ভীষণ ভাবে ব্যার্থ হয়েছিল। কেন প্রতি বছর একটা ভিজুয়াল আর্ট বিষয়ক উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নিজেদের বার্ষিক প্রদর্শনী এই ক্যম্পাসে করতে পারেনি তাঁর নানাবিধ কারনের মধ্যে কয়েকটা এরকম –

  • বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ডিপার্ট্মেন্টকে গুরুত্বপূর্ন কোন ডিপার্ট্মেন্ট হিসেবেই দেখেনাই।
  • পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্দ করার সুযোগ বা সদিচ্ছা ছিলনা।
  • রাজনৈতিক ভাবে এই বিষয় কে টার্গেটে রাখা হয়েছিল, কারন এখানে অনেক শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী ওইসময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সাথে একমত ছিলেন না।
  • নিয়মিত প্রদর্শনী করার মত কোন অবকাঠামো ( গ্যলারী) সেখানে ছিলনা।

দায়িত্বে থাকা চারুকলার শিক্ষক গণ ও নানান ভাবে রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকতেন। অনেক সময় শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রীদের উপর রাজনৈতিক হামলা ও হয়েছে শুধুমাত্র ক্যাম্পাসে শিল্প চর্চা করার অপরাধে।

শিল্পী ও শিক্ষক ঢালী আল মামুনের কলাভবনের শিক্ষক ক্যন্টিনের দেয়ালে আঁকা ম্যুরাল চিত্র কালোকালি লেপে নষ্ট করা হয়েছিল, এর কিছু দিন পর পুনরায় ঢালী আল মামুনের করা অনেক বড় একটা স্থাপনা শিল্প নষ্ট করে তুলে দেওয়া হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে।  শিল্পীকে নানান ভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি এই ক্যাম্পাসে আর কোন শিল্পকর্ম বা পাবলিক আর্ট সম্পর্কিত কর্মকান্ড না করেন। চারুকলার ২য় বর্ষের ছাত্র আমার বন্ধু সঞ্জয় তলাপাত্র কে নির্মম ভাবে খুন হতে হয়েছিল এই ক্যম্পাসের অপরাজনীতির কারনে। তাঁর অসহায় পরিবার আজো তাদের একমাত্র সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে হত্যাকান্ডের স্বীকার হবার ঘটনার কোন তদন্ত রিপোর্ট পায়নি, বিচার তো বহু দূরে। সে সময় যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় পড়েছেন তাদের অনেকেরই জামায়াত ইসলামী ও বি এন পি’র রাজনৈতিক হুমকি পাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই সুবৃহৎ নান্দনিক ও প্রাকৃতিক ভাবে সম্রদ্ধ আবেগ উদ্রেক কারী ক্যাম্পাসে স্বাধীন ভাবে ইচ্ছেমত স্থানে প্রাকৃতিক দৃশ্য অঙ্কনের চেষ্টা করা ও ছিল ঝুকিপুর্ণ। তির্যক মন্তব্য সহ ডিল ছুড়ে দেওয়া হত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যে করে। চারুকলায় পড়তে আসা আরো অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী তৎকালীন ছাত্রশিবির দ্বারা নানান মাত্রায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেছেন। আমার ব্যাচে ১ম বর্ষে ২২ জন ছাত্র ছাত্রী ভর্তী হলেও শেষ বর্ষে আমরা ১১ জন পরীক্ষা দিয়েছিলাম মাত্র।  আমার নিজের এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কারনে আমি প্রাণনাশের হুমকি পেয়ে শেষ বর্ষে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হতে পারিনি, পরীক্ষা দিতে হয়েছে লুকিয়ে যাতায়াত করে । আমদের শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমরা ক্যাম্পাসে সঞ্জয় তলাপাত্রের মৃত্যু বার্ষিকী পালনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া সকল রাজনৈতিক হত্যা কান্ডের বিচার চেয়ে অঘোষিত একটা পাবলিক ইভেন্ট করেছিলাম, সেদিনের সেই কর্মকান্ডের জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের শিবির কর্মীরা অন্তত ৫ জন চারুকলা শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন করেছিল। আমার ক্লাসের একজন ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষনা করে দিয়েছিল ছাত্র শিবির, তাঁর আর মাস্টার্স পড়া হয়নি এই পরিস্থিতির কারনে। তাঁর শিক্ষা জীবনের সেখানেই সমাপ্তি ঘটে। এই নির্যাতন ও বহুমূখী গঞ্জনার তালিকা এখানে লিখে শেষ হবে না। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিশাল ক্যাম্পাস, নয়নাভিরাম প্রকৃতি, মাইলের পর মাইল ভূমি থাকলেও চারুকলা ও নাট্যকলা বিভাগের জন্যে আদতে কলাভবনের নিচ তলায় ১০ -১২ টা অন্ধকার রুম বরাদ্দ ছিল। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্যে কোন কমনরুম, প্রদর্শনী গ্যালারী, মেয়েশিক্ষার্থীদের জন্যে আলাদা টয়লেট, হাত পা ধোয়ার জায়গা, প্রার্থনা কক্ষ, ডাইনিং রুম এসব থাকা তো দুরের কথা এসব যে থাকতে পারে এমন ভাবনা ভাবার ও সুযোগ ছিলনা। শ্রেণী কক্ষ ছিল প্রায় অন্ধকার আর নোংরায় ঠাসা, বসার এবং ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং জড়াজির্ণ, কেউ বসলে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে হত দিন ভর ।

প্রাক্টিক্যাল ক্লাসের আগে একটা প্লাইবোর্ড সরবরাহ করা হত, স্কেচের জন্যে হাফসিট কার্টিজ কাগজ, ড্রইং ক্লাসে একটি ফুলশিট কার্টিজ ও কয়েক সিট নিউজপ্রিন্ট কাগজ, কখনো কখনো অয়েল পেইন্টিং ক্লাসে কিছু টিউব রঙ শেয়ার করে শিক্ষার্থিদের ব্যবহারের জন্যে ডিপার্ট্মেন্ট হতে সরবরাহ করা হত। এক রুমের একটা লাইব্রেরী কক্ষ ছিল যেখানে একজন লাইব্রেরিয়ান বসে বসে ঝিমাতেন, আর বই পত্র পড়তে চাইলে শিক্ষার্থীদের সাথে তেমন কোওপারেশন করতেন না। উনার দুর্ব্যবহারের স্বীকার হতে হত সিরিয়ার পড়ুয়া শিক্ষার্থীগণের । এই রুমের একটা বড় টেবিল আর গোটা ১০ চেয়ার ছিল যা কখনো ডাইনিং স্পেস, কখনো মিটিং স্পেস, কখনো পার্টি স্পেস বা কখনো ভাইবা রুম হিসেবে ব্যবহার করা হত। এই রুমে চেয়ারে বসে এবং পিছনে দাড়িয়ে সর্ব সাকুল্যে ১৫ জন এক সাথে ঢুকার জায়গা হত না। কিছু শিক্ষার্থী লাইব্রেরী কার্ড বানিয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে পড়াশুনা করতে যেতেন। বই পত্র ফটোকপি করার সুযোগ ও ছিল। কিন্তু সেখানে অনেক বই এর গুরুত্ত্বপুর্ন পাতা ব্লেড দিয়ে কেটে নিয়ে গিয়েছিল কোন বিশেষ ধরনের শিক্ষার্থী, ফলে অনেক বই মলাট নিয়েই বেচে ছিল। এসব কালেকশন ছিল ভিষন পুরোনো, সমসাময়ীক বিশ্ব শিল্পকলার তেমন কোন খোঁজ খবর এই সব লাইব্রেরী থেকে পাওয়া মুশকিল ছিল। মাঝে মাঝে কিছু বই পত্র কয়েকজন শিক্ষকের বাসায় গিয়ে ফটোকপি করে নেওয়া যেত। এসব বই আবার কেন্দ্রীয় বা ডিপার্ট্মেন্ট লাইব্রেরীরই সিল দেওয়া থাকত কখনো কখনো, কিন্তু তা জায়গা মত ও সময় মত দীর্ঘ দিন ধরে ফেরত দেওয়া হতো না বলে শিক্ষার্থীদের নিকট সহজপ্রাপ্য ছিল না । তবুও অদম্য শিক্ষার্থীরা এসব খুজে খুজে বের করে পড়ে নিতেন।

আমি চারুকলা বিভাগে ভর্তি হই ১৯৯৬ সালে, পাশকরে বের হয়ে আসি ২০০৩ সালে। মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমার ৭ বছর কেন লাগল ? আমার কোর্স এর মেয়াদ ৪ বছর, আদতে আমার ৮ বছর লেগেছে কেননা ১৯৯৫ তে পাশ করে এই ডিপার্ট্মেন্টে ভর্তি হতেই ১ বছর হাওয়া হয়ে গেছে। ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরুর পর কিছুদিন পর পর শুরু হত রাজনৈতিক দাঙ্গা হাঙ্গামা, এমন ও সময় গেছে ৬-৮ মাস টানা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে আছে অপরাজনীতির কবলে পরে। ছাত্র ছাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নেহায়াত ঠেকে না গেলে কেউ ক্যম্পাসের হলে থাকতে চাইত না। আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী শহরের ষোলশহর, পাহাড়তলি, কিংবা দুই নম্বর গেইটের কাছাকাছি রেলস্টেশনের কাছে হাটার দুরত্ত্বে বাসা নিয়ে থাকতে পছন্দ করত। শহরে থাকার আরো কারন ছিল। অনেকেই নিজের পড়ালেখা ও হাত খরচার টাকা যোগাড় করতে শহরের বিভিন্ন আবাসিকে টিউশন করত। অনেকে নাটকের দল, গ্রাফিক ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও প্রিন্টিং প্রেসে পার্ট টাইম কাজ করতেন, শহরের নানান সাংস্কৃতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে অনেক ধরনের শিল্প আয়োজন চলত, এসবে অংশ নিতে ক্যাম্পাস থেকে প্রতিদিন বা সপ্তায় ৩/৪ দিন আসা প্রায় অসম্ভব ছিল। এসব কারনে চারু শিক্ষার্থীদের শহরে থাকার প্রবনতা ছিল চোখে পড়ার মত। এছাড়া ডিপার্ট্মেন্ট বন্ধ হয়ে যেত ৫ টার মধ্যে, সেখানে ইচ্ছে করলেও নিরাপত্তার কারনে ৫ টার পরে অবস্থান করার কোন সুযোগ ছিলনা। উপরন্ত শহরে অনেক শিক্ষার্থী নিজের উদ্দোগে ড্রইং কর্মশালা করত। কেউ কেউ দল বেঁধে রাত জেগে স্টেশন স্টাডিতে নিজের সময় দিত স্কিল বাড়াতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এই চট্টগ্রাম শহরেই অনেক কর্মকান্ড চলমান থাকত , শহরে থাকা শিক্ষার্থীরা নিয়মিত অংশগ্রহন করত এসব অনুষ্ঠানে, যারা হলে থাকত কিংবা শহর থেকে দূরে থাকত তাদের বেশির ভাগ সময় শহরের ইভেন্ট গুলি মিস হত। আমার পতেঙ্গায় থেকে পড়াশুনা করতে হয়েছে বিধায় আমি সে সময় বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পাড়তাম না।

শিক্ষার্থীরা কেউ কেউ শহরের বাসা থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে যেতেন, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ঝুপড়িতে ডিম খিচুরী খেতেন বা পাউরুটি কলা ডিম ইত্যাদি। চাকসু’র খাবার ছিল ছাত্রছাত্রীর তুলনায় কম এবং নিন্ম মানের। এসব দির্ঘ দিন খেলে কেউ সুস্থ থাকার সুযোগ ছিল না। খাবার ও যাতায়াতের দুর্ভোগ ছিল অসহনীয়, বিশেষ করে শহর থেকে যারা ক্যাম্পাসে আমরা নিয়মিত যাতায়াত করতে হত। যেতে আসতে ৪-৫ ঘন্টা সময় শাটল ট্রেনে, বাসের ধাক্কা ধাক্কিতে কেটে যেত। শাটল এর পরিবেশ ও ছিল ভয়াবহ। অনেক আবেগী বর্ননার আড়ালে এই শাটল বগীর দরজা জানালাহীন বগীতে সন্ধ্যার পরের যাত্রা অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এখনো হয় নিশ্চিত। আমরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সবাই এক বগীতে উঠতাম বিশেষত ফিরার সময়, তবুও মাঝেমাঝে ছিনতাই সহ নানান অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যেত।

যা হোক এসব বলছি কেননা এই ভয়ঙ্কর সুন্দরের প্রেমে গদগদ হয়ে যারা চারুকলা ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নেওয়ার আন্দোলন করছেন তাদের বুঝতে হবে তারা আদতে কেন এই বিষয়ে পড়তে এসেছেন এবং এখন যেই পরিবেশে এই প্রতিষ্ঠান আছে তাতে তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে বাধা কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস বেশী গুরুত্ত্বপুর্ন নাকি নিজের শিক্ষা ও চর্চা নিরবিঘ্ন করে সময় মত পড়াশুনা শেষ করে বাস্তব শিল্প চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করা বেশী গুরুত্বপূর্ন? আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এই চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এমনিতেই অনেক ঝুঁকিতে আছে। দেশের আর্তসামাজিক আবহাওয়া ও রাজনৈতিক পরিমন্ডল এই বিষয়ের পড়াশুনাকে পজিটিভ ভাবে গ্রহন করেনা। এমন অনেকে আছেন যারা নিজের পরিবারে ও সমাজে এই বিষয়ে পড়ার কারনে কোণঠাসা থাকতে হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে চারুকলার চর্চার নানাবিধ চ্যেলেঞ্জ তো আছেই। পাশ করে বের হয়েও অনেকেই আর এই চর্চা অব্যহত রাখতে পারেন না। বাংলাদেশের কালচারাল আবহাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে দৃশ্যশিল্পের সাস্টেইনেবল মার্কেট এখনো নাই। বিশ্বের সাথে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার রয়েছে বিশাল অসামঞ্জস্যতা। এসব বাস্তব সমস্যা মোকাবেলার জন্যে যেই প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছাত্রাবস্থায় তা বিশাল ক্যাম্পাসের নয়ানাভিরাম প্রকৃতিতে ডুবে গিয়ে কি সম্ভব? আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে এই সব জীবন মরণ সমস্যার মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ে এসে আমরা যারা ক্লাস বর্জন করে, শিক্ষকদের রুমে তালা ঝুলিয়ে রাস্তায় এসে বসেছি বিশাল ক্যাম্পাসের নয়নাভিরাম প্রকৃতির মোহে অবস হয়ে, ক্যাম্পাসে ফিরে যাব বলে গো ধরেছি তারা আসলে কি বুঝে এসব করছি তা কি ঠান্ডা মাথায় ভেবেছি? এর পরিনতি কি হতে পারে?

এই আন্দোলনের নামে দেশের প্রধান শিল্পীগণ যারা আমাদের অভিবাবক, তাদের সম্পর্কে যেসব অরুচিকর অসত্য বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে তা ভিষণ দুঃখজনক ও হতাশা জনক, শিল্পী ও শিল্প সমালোচক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আবুল মনসুর, শিল্পী – আধ্যপক অলক রায় ও প্রয়াত একুশে পদক প্রাপ্ত শিল্পী মনসুর-উল-করিম কে যে ভাষায় আন্দোলন কারীরা উল্যেখ করছেন তাতে আপনাদের জন্যে চিন্তা হয় , লজ্জা লাগে । কি পরিমাণ অপরিনামদর্শী ভাবনায় তাড়িত হলে একজন সম্মানীত ব্যাক্তির ব্যপারে এধরনের অভিযোগ আনতে পারে কেউ। ভাবুন , নিজের দিকে তাকান, যারা আপনাদের উত্তেজিত করছেন তাদের জীবনের কোন এচিভমেন্ট নাই। ভালো করে খোঁজ করুন, নিজেই নিজের সর্বনাশ করার এই পথ থেকে সময় থাকতে সরে দাড়ান। এই সব উসকানি দাতারা আখেরে আপনাদের পাশে থাকবে না। নিজের এবং আরো অনেক ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবন ধ্বংসের কারন হবে এই আন্দোলন। যারা এই আন্দোলনের উস্কানি দেয় উনাদের গভীর দুরভিসন্ধি আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম সরকারী চারুকলা কলেজের একীভুত না হবার বিকল্প কোন পথ ছিলনা। চট্টগ্রামে চারুশিক্ষার প্রায় অকেজো হয়ে পড়া ২ টি সরকারী প্রতিষ্ঠানকে এক করে শহরের কেন্দ্রে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া অনেক জঠিল ছিল। অনেকের শিক্ষাজীবন, ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার বলি দিতে হয়েছে এই উত্তরন এর পিছে। বর্তমান ক্যাম্পাসে চারুকলার স্থানান্তরের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মূল ধারার সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে দৃশ্যমান পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এখন চট্টগ্রাম থেকে শিল্পীরা দেশের সব জাতীয় প্রদর্শনী ও অনেক আন্তর্জাতিক কর্মকান্ডে ঢাকার শিল্পীদের সাথে সমান অংশগ্রহন নিশ্চিত করে যাচ্ছে, যা আমরা এক সময় ভাবতে ও পাড়তাম না চট্টগ্রামে বসে। এই ধারা আরো বেগবান করার সুযোগ আছে। বন্দর নগরীর তকমা ছাপিয়ে চট্টগ্রাম শিল্পের নগরী হয়ে উঠবে আমরা এমন স্বপ্ন দেখি। এই শহর একসময় এই অঞ্চলের চারুকলার স্বতন্ত্র চর্চার যে পরিচিতি গড়ে উঠছে তাঁকে ব্রান্ড করে নিজের পরিচয় বিনির্মান করবে বিশ্বের বুকে, আমরা এমন স্বপ্ন দেখি। আর এসব সম্ভব হবে চারুকলা ইন্সটিটিউট এর বর্তমান অবস্থান কে আরো সুদৃঢ় ও কার্যকর করার মাধ্যমে। উল্টো পথে চলার  এবং মূল ক্যাম্পাসে ফিরে যাবার যে আন্দোলন তা বেকোয়ার্ড পলিটিক্স, এবং কিছু ব্যার্থ মানুষের দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। নবীনদের পিছন মুখী হলে চলে না, সামনে এগুতে হবে। বাংলাদেশে সারা দুনিয়ার প্রবেশ পথ এই চট্টগ্রাম শহর। এঁকে উপেক্ষা করে কেন জঙ্গলে যাবেন ভাই? পজিটিভ ভাবুন, দুনিয়া আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে শিল্পের অপার সম্ভাবনা সাজিয়ে , এসব সেকেলে আবেগ ঝেড়েফেলে দুনিয়ার দিকে তাকান। পড়াশুনা সময় মত শেষ করে চারুকলার মূলধারায় নিজেকে নিবিড় ভাবে নিয়োজিত করুন, নিজে সফল হবেন। এতে শিল্পী রশিদ চৌধুরী সহ এই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কন্ট্রিবিউটর শান্তি পাবেন।

চট্টগ্রামের এবং দেশের একমাত্র সরকারী চারুকলা কলেজটি কেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাথে একীভূত করা হল? কি ছিল এর পেছনের কাহিনী। বড়দের সাথে আলাপ করে সত্য সমস্যাগুলি জানার চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ। চট্টগ্রামে চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠত হয়েছিল বেসরকারী নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে শিল্পী রশিদ চৌধুরীর চেষ্টায়। পরবর্তীতে নানা চেষ্টা তদবিরে এটিকে সরকারী করনের মাধ্যমে সরকারী চারুকলা কলেজ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। কিন্তু দেশের প্রচলিত সরকারী শিক্ষা ব্যাবস্থার বাইরে এই কলেজ কে শিক্ষা বোর্ড আলাদা করে পরিচালনা করতে পাড়ছিল না। বাস্তবে চারুকলার শিক্ষা পদ্ধতি সাধারন কলেজের শিক্ষা পদ্ধতির চাইতে একেবারেই ভিন্ন, এর পাঠের ও আনুশীলনের ধরন, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বা বাৎসরিক দক্ষতা মূল্যায়নের পদ্ধতি সহ সব কিছু একেবারেই ভিন্ন।  এছাড়াও চট্টগ্রামের সরকারী চারুকলা কলেজটি ছিল দেশের এক মাত্র সরকারী চারুকলা কলেজ। এসব বাস্তব কারন জানা থাকা সত্বেও এখানে শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা পদ্ধতি সহ নানান বিষয়ে সরকারি কার্যক্রম অন্য সরকারী কলেজের নিয়মেই করতে হত, কেননা একটি মাত্র চারুকলা কলেজ পরিচালনার জন্যে সরকারী ভাবে বিশেষ বিধিমালা প্রনয়ন ও বেশ জঠিল হয়ে উঠেছিল।  তাই এখানে প্রিন্সিপাল নিয়োগ দেওয়া হত অন্য কলেজের ইংরেজীর বা অংকের শিক্ষক, এরকম আরো অনেক নিয়োগ হত যা চারুকলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে ও পাঠক্রম পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চারুকলা কলেজের তথকালীন শিক্ষার্থীরা এই অভিজ্ঞতা গুলি নবীনদের জন্যে শেয়ার করাবেন আশা করি। এই পরিস্থিতিতে সরকারী চারুকলা কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কলেজটি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চারুকলা কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে জেলেও যেতে হয়েছিল এই সব আন্দোলন করতে গিয়ে। একই সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীদের শ্রেনীকক্ষ, ও অন্যান্য অসুবিধা নিরসনের লক্ষ্যে বিভাগটিকে  ইন্সটিটিউটে রূপান্তরিত করার দাবী করে গড়ে উঠা আন্দোলন চলছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ ও চট্টগ্রাম সরকারী চারুকলা কলেজের অচলাবস্থা র সমস্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিগোচর হলে এই বিষয়টি নিষ্পত্তির দায়ীত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় নেত্রীবৃন্দের উপর।

\"\"

সে সময় অনুষ্ঠিত এক সভায় দুটি সমস্যায় জর্জরিত সরকারী চারুকলা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান এর চলমান সংকট সমাধানে এক চমৎকার প্রস্তাব উত্থাপন করেন তথকালীন জনপ্রিয় সিটি মেয়র জননেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী। যার প্রস্তাবে সবাই আশার আলো দেখেন। কিন্তু এই প্রস্তাব উত্থাপনের সাথে সাথেই এটি গৃহীত হয়নি। এই প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, স্থানীয় নাগরিক বৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ও প্রভাবশালী শিক্ষকবৃন্দ ও দেশের বিশিষ্ঠ চারুশিল্পীদের মতামত গ্রহণ করা হয়, চলে দীর্ঘ বিতর্ক। সে সময় চারুকলার বিষয় হিসেবে নগর কেন্দ্রিকতা ও চট্টগ্রাম নগরীর সাংস্কৃতিক চর্চার ধারাকে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় বিনির্মানের সম্ভাবনাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল সরকারী সম্পত্তির কার্যকরি ব্যবহারের বিষয়টি ও। এছাড়া সরকারী চারুকলা কলেজের যে পাঠক্রম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সমমানের ধরা হত তাঁর নানাবিধ দুর্বলতা ছিল, যেসব কারনে সমসাময়ীক বিশ্ব শিল্পকলার মূল ধারার চর্চার সাথে কলেজের শিক্ষার্থীদের তাল মিলাতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। অনেকের বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুসরন করার সামর্থ্য ও তৈরি হতোনা। এস এস সি’র পরেই যারা কলেজে ভর্তি হয়ে চারুকলার প্রাক্টিক্যাল আনুশীলনের চাপে পড়ে যেত, তারা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বিশ্ব শিল্পকলার মূল ধারার চর্চার জন্যে লেখাপড়ার বিত্তিভুমি মজবুত করার সময় পেতোনা আর। আর সেই সময় টাতে বিশ্ব শিল্পকলার মূলধারায় স্কিল এর চাইতে কন্সেপ্ট ও বুদ্ধিবৃত্তির গুরুত্ব যে বাড়ছে তা আমাদের স্কলারগণ ভালোভাবেই অনুধাবন করছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে কলেজ পর্যায়ে চারুশিক্ষার ব্যাপারটিকে তারা নিরুৎসাহিত করেছিলেন, এবং কলেজ কে ইন্সটিটিউটের সাথে একীভুত করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।  পরবর্তীতে সামগ্রীক বিবেচনায় চট্টগ্রামের ২ টি সমস্যা আক্রান্ত চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ইন্সটিটিউটে রূপান্তরিত করে চট্টগ্রাম শহরে এটিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের ঘোষনা আসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। এতে সব সব পক্ষ খুশি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম দল গুলি ও জামাত শিবির এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে। তারা বিভাগের প্রবীন শিক্ষক ও দেশের প্রধান ভাষ্কর্য শিল্পী সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ কে নানান ভাবে ক্ষেপিয়ে এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করতে প্ররোচিত করেন এবং তিনি মামলা করেন। এই মামলায় স্থানান্তর প্রক্রিয়া ঝুলে গিয়ে আর্ট কলেজের অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন শেষ হয়ে যায়। বেশ কয়েক বছর মামলা চলে এবং এক সময় এই মামলা খারিজ হয়ে যায় আদালতে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তেই তৎকালীন ভি সি অধ্যাপক আবু ইউসুফের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে ইন্সটিটিউট চট্টগ্রাম শহরে স্থানান্তরিত হয়। এতে সেই মন খারাপ করা গোষ্ঠী থেমে থাকে নি, তারা এখনো এই ইন্সটিটিউট এর শহরে আসা মেনে নিতে পারে নি। কিন্তু তাদের কাছে প্রশ্ন তারা এর চাইতে ভালো কোন সমাধান তখন কেন সাজেস্ট করেনি। আদতে তা ছিল না। এখন এতদিন পরে এই মীমাংসিত সমস্যাকে নতুন করে সামনে এনে কিছু নবীন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ক্ষতি করে কি লাভ দেখছে তারা তা আমার মাথায় আসে না।

\"\"

দেশের ২য় বৃহত্তর শহর চট্টগ্রাম, এর কেন্দ্রে অবস্থিত বর্তমান চারুকলা ইন্সটিটিউট। বাদশামিয়া রোডের এই অবস্থান থেকে সি আর বি, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, দেশের বৃহত্তম বন্দর, বিমান বন্দর, পাহাড়তলী, কর্নফুলী নদীর ঘাট সমুহ সহ কত কত দর্শনীয় স্থান সহজেই যাতায়াত করা যায়। মানুষ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে ঠাসা এক দুর্দান্ত শহর কে পাশ কাটিয়ে কি বুঝে ২২ কি মিটার দূরে অবস্থিত একটি জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত জায়গায় চারুকলা কে ফিরে যেতে হবে? জন-যোগাযোগ, প্রকৃতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র, রাজনৈতিক কেন্দ্র সমুহ,সমাজ সম্প্রিতক্ততার সুযোগ কি নাই বর্তমান অবস্থানে? শহরে রয়েছে বর্তমান সময়ের সর্বাধুনিক পাব্লিক লাইব্রেরী, ব্রিটিশ কাউন্সিল, শিল্পকলা একাডেমী, আলিয়স ফ্রানসেস, জার্মান ও রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার সহ আরো নানান ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সমুহ যা ছাত্র ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার তৈরিতে বহুমুখী কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকে সারা বছর। এসব সুযোগ সুবিধা চারুকলার যে কেউ নিতে পারে নিজের নিয়মিত পড়ালেখার পাশাপাশি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আর্ট গ্যালারীটি দেশের ২য় বৃহৎ সরকারী আর্ট গ্যালারী যা চাইলেই চারুকলার শিক্ষার্থী, শিক্ষক গণ ব্যবহার করতে পারেন। ইন্সটিটিউট থেকে এই গ্যালারী মাত্র ১০ মিনিটের হাটার দুরত্বে অবস্থিত। অনেকে এসব সাপোর্ট কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মকান্ডের ব্যাপ্তি শহরময়, বিশ্বময় ছড়িয়ে দেবার সুযোগ পেয়েছেন শহরে ইন্সটিটিউট স্থানান্তরিত হবার করনে। খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, ইন্সটিটিউট ক্যাম্পাসে থাকা কালীন ছাত্র ছাত্রীদের কজন এই সুবিধা গুলি নিতে পেরেছিলেন? যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পড়তে যাবেন তখন এই সুবিধে গুলি কি সহজলভ্য থাকবে আপনাদের জন্যে? বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শহরের যেই দুরত্ত্ব তাতে কেউ নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাসে ৫ টা পর্যন্ত ক্লাস করে শহরে এসে কোন প্রতিষ্ঠানে নিজের পছন্দের কাজটিতে আর ইচ্ছে করলেও যোগ দিতে পারবেন না। 

আর যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাস খুব টানে তাদের জন্যে তো সেটি এখন নিষিদ্ধ করে নি কেউ? আপনার যখন খুশি সাটল ট্রেনে চড়ে যাবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। হ্যা, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার কর্মকান্ড নিঃসন্দেহে আলংকরিক, সোভা বর্ধন কারী। সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যম্পাসে একটি চারুকলা চত্বর তৈরির চেষ্টা করুন, যাতে যুক্ত থাকবে সেমিনার হল, প্রদর্শনী গ্যালারী, ও ইন্সটিটিউটের স্যাটেলাইট অফিস ও খোলা প্রাঙ্গন বা মুক্ত মঞ্চ । এটিকে কেন্দ্র করে চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী ও দেশবিদেশের চারুশিল্পী গনের নিয়মিত পদচারনায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মুখরিত থাকতে পারবে, সাথে সাথে ইন্সটিটিউট এর ছাত্রছাত্রীদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয়ে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের সাথে ভাবের আদান প্রদান বাড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ উন্নত হবে, এতে সব পক্ষ সমৃদ্ধ হবে।  আপাতত অবকাঠামো ছাড়াই চাক্সু ভবন এবং জারুল তলা চত্বরকে কে ঘিরে চারুকলা চত্বর তৈরি করে নিতে শুধু সদিচ্ছার প্রয়োজন। এছাড়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান যে কোন সাংস্কৃতিক আয়োজনে চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা চাইলেই নিজেদের যুক্ত করতে পারেন।  চারুকলা ইন্সটিটিউট কিছু প্রাক্টিকাল আউটডোর স্টাডি নিয়মিত ভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যেতে পারেন, এটির জন্যেও কোন অবকাঠামো শিফট করা লাগে না, লাগে সদিচ্ছা টুকু, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাসে চারুকলা না থাকার আফসোস তো থাকার কথা না। কারো ইচ্ছে হলে, সামর্থ্য থাকলে সেখানে গিয়ে রাজনীতি ও করুন, কিন্তু সেই জন্যে তো পুরা ইন্সটিটিউট সেখানে নিয়ে যেতে হয় না।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীগন চট্টগ্রামের মত একটা বৃহৎ শহরে নানাবিধ নাগরিক সুবিধার মধ্যে থেকে, বৈচিত্রময় এই নাগরিক পরিবেশে যদি নিজেকে বিকশিত করতে না পারেন তবে কি করে জোবরা গ্রামে জনবিচ্ছিন্ন গ্রামীন পরিবেশে গহীন প্রকৃতিতে ডুবে তা পারবেন বলে আশা করেন তা ভেবে পাইনা আমি। আর হলফ করে বলুন তো আপনার বিষয়ের বা চারুকলার কর্মকান্ডের ভোক্তা কারা ? তাঁর কি বাংলাদেশের কোন গ্রামে থাকেন? আদতে চারুকলা বিষয় হিসেবে নাগরিক জন-জীবন ঘেষা, এর ভোক্তা শ্রেণী শহরে বসবাস করে। এর চর্চার ও বিপননের সমস্ত প্রতিষ্ঠান বিশ্বের শহর গুলিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে ও বিকশিত হয়েছে। অনেকে শান্তি নিকেতন এর কথা বলবেন এই প্রসঙ্গে, কিন্তু বুঝতে হবে শান্তি নিকেতন সম্পুর্ন আবাসিক কলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং এর নাগরিক যোগাযোগ আন্তর্জাতিক মানের। তদুপরি, বিশ্বকবি ও শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররে মতন একজন প্রবাদ প্রতীম ব্যক্তিত্ব কোথায় পাবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট বিনির্মানের জন্যে, সেরকম কি কাউকে পাওয়া গেছে আপনাদের পরামর্শ দাতেদের মধ্যে? আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কি সেই আয়োজন করতে দিবে আপনাদের?

চলমান আন্দোলন আত্মঘাতী আন্দোলন।  চট্টগ্রামের চারুকলার বিকাশের ক্ষেত্রে, দেশের চারুকলা চর্চার গুনগত মান উন্নয়নের ও প্রতিবন্ধক পশ্চাত্মূখী আন্দোলন।

আসুন এসব অপ রাজনীতি বাদ দিয়ে শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত চবি\’র এই ইন্সটিটিউট কে কিভাবে বিশ্বমানে গড়ে তোলা যায় , কি করে ছাত্রছাত্রীদের মৌলিক চাহিদা গুলি মিঠানো যায়, এই বিদ্যমান ক্যাম্পাস কে কি করে চট্টগ্রামে আরো বিস্তৃত ও বিকশিত করা যায় সেই বিষয়ে কথা বলি।

আমাদের দেশের প্রচলিত শিল্পচর্চার সব চাইতে দুর্বল দিক এর জনবিচ্ছিন্নতা। দেশের সাধারন মানুষের রুচি, চিন্তার গতিপ্রকৃতি, দৈনন্দিন জীবনাচার নিবিড় ভাবে পাঠ করতে না পাড়লে কি করে সত্যিকারের জনসম্প্রিক্ত শিল্প চর্চার পথ তৈরি হবে? ইন্সটিটিউট এর শহরের অবস্থান ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের নাগরিক সমাজ ও এর সংস্কৃতির নিবিড় সান্নিধ্যের এক অমুল্য সুযোগ, এটি দেশের শিল্প চর্চার ক্ষেত্রে যেমন নতুন বৈশিষ্ঠ তৈরি করতে সক্ষমতা দিবে তেমনি আপামর নাগরিক জীবনের গুনগত মানের উপর প্রভাব ফেলতে সহায়ক হবে। তাই চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত এই ইন্সটিটিউট এখান থেকে সরিয়ে নেবার চিন্তা মোটেই ভালো চিন্তা নয়। এই বিষয়ে চট্টগ্রেমের নাগরিক, শহরে বসবাসকারী শিল্পীদের এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আরো সোচ্চার ও কার্যকরী ভূমিকা প্রত্যাশা করি। ছাত্রছাত্রীদের উচিত এরকম বিধ্বংসী আন্দোলন বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের থেকে কি করে চারুকলা চর্চার ও শিক্ষার মান উন্নয়ন করা যায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যম্পাসের সাথে আরো বেশী সম্পৃক্ত হওয়া যায় তাঁর জন্যে সৃজনশীল ও কার্যকরী ভূমিকা রাখা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্র মিলনায়তন চারুকলার দক্ষিণে পুলিশের জায়গার হবে শুনেছি , এতে আমরা বেশ খুশি হয়েছিলাম। কেননা চারুকলার দেয়াল ঘেষে পুলিশের জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্র মিলনায়তন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের আনাগোনায় চারুকলার কর্মপরিবেশ সমৃধ হবে। সেই মিলনায়তন নির্মানের চেষ্টা চলুক, কিন্তু বিদ্যমান এই ক্যাম্পাসে সেটি হতে দেওয়া যায়না। এটি ঠেকাতে আন্দোলন করুন, যে টুকু দখলে করতে চেষ্টা হয়েছে তা পূনর্দখল করার চেষ্টা করুন। আবেগ নয় শত শত মানুষের প্রায় অর্ধ শতাব্ধী সময়কাল ব্যাপী  নিরলস চেষ্টায় তিল তিল করে গড়ে উঠা একটা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করারর গভীর চক্রান্ত চলছে, এই চক্রান্তে আপনার ভূমিকা এক দিন না একদিন আপনাকে নিজের বিবেকের কাটগড়ায় দাঁড় করাবেই। তাই এসব বিধ্বংসী আন্দোলন ও চক্রান্ত বন্ধ কারুন, এতে সবার মঙ্গল হবে। 

ধন্যবাদ!


এই বিষয়ে আরো জানতে পড়তে পারেন

\”চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটে চলমান পশ্চাত্মূখী আন্দোলন প্রসঙ্গেঃ\”

\” চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক চর্চার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে আন্দোলনের নামেঃ\”

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের আরো কিছু শিল্পীর মতামত সংযুক্ত করলাম যারা এই ২ প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা বা শিক্ষকতা করেছেনঃ

চট্টগ্রামের দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের লিঙ্কঃ

চট্টগ্রাম চারুকলাকে মূল ক্যাম্পাসে ফেরানোর দাবি কতটা যৌক্তিক

আবুল মনসুর / অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

\” ১৯৭৪ সালে যখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চারুকলা বিভাগে শিক্ষকতায় যোগ দিই, তখন একটি কথা আড়ালে–আবডালে বা কখনো প্রকাশ্যে বলাবলি হতো—চারুকলা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো একটি বিষয় নাকি! সেই বাস্তবতার বদল হয়েছে বটে, তবে অন্যান্য চলতি বিষয় থেকে পৃথক হওয়ার কারণে চারুকলা নিয়ে বিভ্রান্তি ও ভুল–বোঝাবুঝির অবসান হয়নি। বিষয়টি নিয়ে ভাবার কারণ হলো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে কিছু শিক্ষার্থীর বিভিন্ন দাবিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিক্ষোভ ও অচলাবস্থায় আমার ব্যক্তিগত উদ্বেগের জানান দেওয়া। তাঁদের মূল দাবি চারুকলা ইনস্টিটিউটকে মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাঁরা ‘ফিরে আসুক চারুকলা’, ‘২১০০ একর জানে না, চারুকলার ঠিকানা’; ‘চারুকলা ক্যাম্পসে আনো’ ইত্যাদি স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আন্দোলন করেছে।\”

দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোতে প্রকাশীত লেখাটি বিস্তারিত পড়তে লিঙ্কটিতে ক্লিক করুন

দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোতে প্রকাশীত লেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শিল্পী তাজুল ইমাম ভাইয়ের মতামত ও তুলে ধরা গেল নিচে।

মনে   হচ্ছে   বিশ্ববিদ্যালয়   ক্যাম্পাসে   পড়াট   একটা   কেতাদুরস্ত   ব্যাপার।   নিজেদের   কুলিন   ভাবা   যায়।কিন্তুচারুকলার   শিল্পশিক্ষার্থিদের   জন্য   এই   কুলিন   ভাব   রুচিগর্হিত।   চারুকলা   কলেজ   ছিল   চট্টগ্রামশহরের   সাংস্কৃতিক   ধমনি।   এই   কলেজকে   ঘিরেই   গড়ে   উঠেছে   চট্টগ্রামের   বিভিন্ন    সাংস্কৃতিকআন্দোলন।   চারুকলার   ছাত্র   শিক্ষকদের   প্রত্যক্ষ   প্রভাব   ছিল   প্রতিটি   কর্মযজ্ঞে।   একজন শিল্পশিক্ষার্থীর   গভীর   অভিনিবেশের   পরিবেশ   এই   মনোরম   ভবনটিতে   অনেক   বেশী   সহজলভ্য। সকাল   থেকে   শুরু   করে   মধ্যরাত   পর্যন্ত   কাজ   করার   সুযোগ   ও   সময় পাওয়া   যায়। শিক্ষকদের   নৈকট্য  (  যা   শিল্পশিক্ষায়   অতিপ্রয়োজন ) অনেক   নিবীড়   প্রদর্শনী   আয়োজন , দর্শক   ও   পৃষ্ঠপোষকদের   সাথে    সরাসরি   যোগাযোগ ,  প্রচার –  এ   সব   কিছুই   নগরের   প্রানকেন্দ্রে   বসে   অতি   সহজেই   সম্পন্ন   করা   যায়। আমি   বলতে   চাচ্ছি   শিল্প   শিক্ষাই   যদি   উদ্দ্যেশ্য   হয় তাহলে   চট্টগ্রাম   শহরের   চারুকলা   ভবন   অবশ্যই সব দিক   থেকে   উপযোগী।   ইন্জিনীয়ারিং   কলেজ   বা   মেডিক্যাল   কলেজের   মত   চারুকলা   ইন্সটিটিউট   ওএকটি   সম্পুর্ন   সতন্ত্র   বিদ্যাপিঠ   হবার   দাবি   রাখে।   তারপর   আসে   আর্থিক   সুবিধা।   এ   কথা   মানতেই হবে   চট্টগ্রাম   বিশ্ববিদ্যালয়ে   লেখাপড়াকরা   বাংলাদেশের   যে   কোন   বিশ্ববিদ্যালয়ের   চেয়   ব্যায়বহুল। শুধুযাওয়া  আসাতেই   সময়ও   অর্থ   ব্যায়   অনেক   অভিভাবকের   জন্য   দুঃসাধ্য।   আমার   ব্যাক্তিগতঅভিজ্ঞতা   চারুকলা   পড়তে আসে   নিম্ন   ও   মধ্যবিত্ত   পরিবারের   ছেলেমেয়েরা ।  শহর   থেকে   স্থানান্তরিত হলে   এদের   অনেকেরই   শিল্প শিক্ষার   স্বপ্ন   পুরন   হবেনা।   অভুক্ত   থেকে   রং   তুলি   কাগজ   কেনা   যায় কিন্তু ট্রেন   বাসের   টিকেট   কাটা   যায়না । ছাত্রদের   বলছি   সহানুভূতিশীল   হয়ে বিবেচনা   করুন।   একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের   বিভিন্ন   ক্যাম্পাস   ফ্যাকাল্টি   থাকে ,  এফিলিয়েটে   কলেজ   থাকে।   চারুকলাইনস্টিটিউটও   তেমনি   ভাবে   চট্টগ্রাম   বিশ্ববিদ্যালয়ের   অনুষদ   হয়ে থাকতে   পারে।   অনেক   ত্যাগ তিতিক্ষার   বিনিময়ে   চারুকলা   কলেজ /  ইন্সটিটিউট   প্রতিষ্ঠিত   হয়েছে। একে   একটি   নিছক   বিণোদন কেন্দ্র   বানিয়ে   আমাদের   শ্রদ্ধেয় প্রিয়া   শিল্পীদের   স্বপ্নকে   ধ্বংশ   করে   দেবেননা।   একান্ত   প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে   আগের   মত   আরেকটি   ফাইন   আর্টস   ফ্যাকাল্টি   হোক   তবে   চারুকলা   ইনস্টিটিউট   যেন বন্ধ   হয়েনা   যায় ।   এখানে   পাশাপাশি   একটি   সংগীত   বিভাগ   চালু   হতে   পারে।   নাট্যকলা ,  নৃত্য ,  কম্পিউটার   গ্রাফিক্স   বিভাগ ,  সাউন্ড   রেকর্ডিং ,  ফিল্ম /  ভিডিও /  মাল্টি   মিডিয়াবিভাগ   চালু   হতে   পারে। আপনারা   সেসব   নিয়ে   আন্দোলন   করুন।   ইতিহাসে   স্থান   পাবে   আপনাদের  অবদান।
তাজুল ইমাম . Tajul Imam
চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ, ২য ়ব্যাচ