স্বপ্নগুলি ধূসর হয়ে উঠে ধীরে…

১৯৯৭-৯৯ এই বছর গুলিতে পতেঙ্গা আর আনোয়ারা থানার জুল্ধা, দেয়াং এর অনেক এলাকায় ঘুরেছি ছবি আঁকতে। আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের স্কাল্পচার এর রুমে এবং আরো কয়েকটি রুমে অযত্নে পরে ছিল কিছু প্যানেল, সাধারন কৌতূহলে একদিন একটা ধুলির আস্তর পরা প্যানেল নেকড়া দিয়ে পরিষ্কার করে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কি সুন্দর একটা ল্যান্ডস্কেপ, পরে এরকম আরো প্যানেল খুঁজে পরিষ্কার করে দেখে ছিলাম, লাইব্রেরি থেকে বই খুঁজে এই সব ছবির শিল্পী ও তাঁর প্র্যাকটিস সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব, মূলত ব্রিটিশ শিল্পী কন্সটেবল আমাকে পেয়ে বসেছিল। কন্সটেবল আর টার্নার এর ল্যান্ডস্কেপ দেখতাম সারাক্ষন। মাথার ভিতর কন্সটেবল ঘুরত সারাদিন, দৃশ্য খুঁজে বেড়াতাম যেখানে ই যেতাম। এই দুর্দান্ত ভাললাগা অনেক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনাকে পাশে রেখে আমাকে এগিয়ে দিয়েছিল বহুদূর। 

\"\"
ব্রিটিশ শিল্পী কন্সটেবলের ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং

এই ঘোরের মধ্যে কেটে গেছিল প্রায় ৩ বছর। এর মধ্যে অনার্স সেকেন্ডইয়ার ফাইনাল হয়ে গেছে। ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার সাথে রেজান্ট-পলিটিক্স কিছুটা বুঝতে পেরেছি, যা বুঝেছি তা রীতিমত ভয়াবহ। এখানে পড়া লেখার পাশাপাশি স্যারদের নানান লবিং, গ্রুপিং চালু আছে। কোন কোন প্রবীন স্যার নিজেদের পছন্দের ছাত্রছাত্রীদের নানান কায়দায় ফাস্টক্লাস পাইয়ে দিতে সক্ষম, এবং এর সাথে খাপ খাওয়াতে গেলে অনেক কিছুই করতে হয় ছাত্রছাত্রীদের যা এই পরিসরে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন দেখছিনা। তবে এইটা বুঝেছি এই রকম ভালো রেজাল্ট আমার চাই না। আমি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হতেও চাইনা কোন কালে। যা হতে চেয়েছি, যেই প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ আমাকে সুদূর পতেঙ্গা থেকে এখানে তাড়িয়ে আনে প্রতিদিন সেই আকাঙ্ক্ষা দিনে দিনে ফিকে হতে থাকে। মনে হয় ভুল করেছি, ভর্তির আগে শ্রদ্দ্বেয়  কবি ও শিল্পী হাবিব আহসানের পরামর্শ আমার মনে পড়ে তখন। আমি তাঁর উপদেশ অগ্রাহ্য করে এখানে এসে আদতেই ভুল করেছি মনে হয়েছে বার বার। মনে হচ্ছিল আমার সময় ও সামর্থ্যের অপচয় করছি অহেতুক। তবুও শেষ না করে থামা যাবে না, কিন্তু এর থেকে মুক্তির পথ খুজতে হবে। 

\"\"
ব্রিটিশ শিল্পী জোসেফ মালর্ড উইলিয়াম টার্নারের ল্যান্ডস্কেপ

বন্ধু, সিনিয়রদের আড্ডায় এসব নিয়ে অনেক আলাপ তুলেছি, নিজে ভাবার চেষ্টা করেছি গভীর ভাবে। দেশের আর্তসামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক কালচার, সব কিছুই শিল্পচর্চার জন্যে বৈরী। এখানে ফাইন আর্টসের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখার শেষ করে শিল্পী হিসেবে নিজের চর্চা ধরে রাখতে পারেন না।  খেয়েল করে দেখলাম আমার আগের প্রায় ৭ ব্যচ থেকে পাশ করে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ৪/৫ জনের বেশী কাউকে নিয়মিত প্রাক্টিসে দেখছিনা। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হয়ে, বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ডিজাইনার হিসাবে কাজ করেন কিংবা অন্য পেশায় চলে যান। চারুকলা থেকে পড়ে ব্যাংকে চাকরি করেছেন এক বড়ভাই। এরকম সব ইনফরমেশন আসছিল আর ভাবছিলাম এই ইন্সটিটিউট এর আদতে উদ্দেশ্য কি? এর যেই কারিকুলাম আমরা পড়ছি, এ জয়নুল আবেদীনের ঢাকা আর্ট কলেজের কারিকুলাম, যা কিনা কলকাতা আর্ট কলেজে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রবর্তিত, এর খুব বেশী পরিবর্তন বা আপডেট এখানে ঘটেনি। সমসাময়ীক শিল্পকলার যা খবরাখবর পত্রপত্রিকা ঘেঁটে পাই তাঁর সাথেও এই কারিকুলামের কোন সংগতি নাই। যা পড়ছি তাতে ডিজাইন ও খুব বেশী ভাইটাল না, যে পাশ করে ডিজাইনার হিসাবে কম্পিটিটিভ মার্কেটে খুব কাজে আসবে এই বিদ্যা। 

মূলত অনেকেই আন্দরকিল্লায় কিছু প্রেস টেকনিশিয়ানের কাছে গ্রাফিক ডিজাইন বেইজ সফটওয়্যার গুলি শিখে রাখছেন চারুকলায় পড়ালেখার পাশাপাশি, যাতে পাশ করে বের হয়ে একটা চাকরী পাওয়া যায় কোন এডফার্ম কিংবা প্রেসে। এই সব কাজের ফাকেই মাঝে মাঝে ছবি আঁকবেন, নয়তো শিক্ষকতা করবেন বা আর্ট স্কুল চালাবেন, ফাকফোকরে সময়করে ছবি আঁকবেন। মূলত ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে নেবেন বা নিয়েছেন এমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া দুরূহ।  আর একটা বিষয় সামনে আসল, যারা আদতে এই দেশে শিল্পী হিসেবে নাম করেছেন এদের প্রায় সবাইই কোন না কোন ইন্সটিটিউট এর শিক্ষক, এর মানে দাঁড়ায় এই যে গড়পড়তায় তাঁরাই এই দেশে শিল্পী, যারা এই সব ডিপার্ট্মেন্টে ফাস্টক্লাস পেয়েছেন, আর সেই সুবাদে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষকতা যে একটা আলাদা পেশা তা ইনাদের আর্টিস্ট পরিচয়ের সাথে মিলেমিশে একাকার। ইনাদের অনেকের শিল্পকর্ম দেখে আর শিক্ষকতার ধরন দেখে মনে খুব কষ্ট পেতাম। মনে হত কি দুর্ভাগা এই মানুষ গুলি, হতে পারলেন না শিক্ষক, না হতে পাড়লেন শিল্পী, ঝুলে আছেন যেন এক অমীমাংসিত সীমান্তে। এই সব অনুসন্ধান আর উপলব্ধি আমার উদ্দ্যমকে ধীরে ধীরে দমিয়ে দিতে থাকে। আমি চিন্তিত হয়ে উঠি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দক্ষতা কিংবা শৈল্পিক মন থাকলেই এই দেশে শিল্পী হওয়া যাবে না এই বাস্তবতা আমার বোধের রাজ্যে রীতিমত নতুন উৎপাত হিসেবে আবির্ভুত হল। আমি বিকল্প অনুসন্ধানে সময় বাড়ালাম। বেশ বুঝতে পারলাম আমার শিক্ষক কিংবা ডিজাইনার হবার যেহেতু কোন ইচ্ছা বা আগ্রহ নাই আমাকে অন্য কোন পথ বেছে নিতে হবে নিজের ভাললাগার বিষয়ের সাথে নিজেকে ধরে রাখতে।

(চলবে)