চারুশিল্পের বাজার ও এর ঢাকাই হালচাল

শুরুতেই বলে রাখি, আমি বিগত ২০/২২ বছরের ব্যক্তিগত শিল্পচর্চায় বাজারের বাইরের শিল্পচর্চা বা বিকল্প পন্থার শিল্পচর্চায় যুক্ত রেখেছি নিজেকে। কিন্তু বাজার মুখী চর্চার গতিপ্রকৃতির খেয়াল না রাখলে তো বিকল্প পরিসরকে বুঝা হয়না ঠিকঠাক, তাই সব সময় বাজার ট্রেক করেছি, এবং এর গতিবিধির খবর রেখেছি ও রাখি। এই লেখায় মূলত দেশের আর্ট-মার্কেটের বর্তমান পরিস্থিতি ও এতে আমাদের করিনীয় নিয়ে কিছু পর্যালোচনার সুত্রপাত করতে চাই। এতে অনেক ভিন্নমত ও বিকল্প ভাবনা থাকবে, যারা এই লেখা পড়বেন তারা এর উপর মতামত রাখবেন, যা এই লেখাকে, এই আলাপ কে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে এই কামনা করি।

বাংলাদেশের চারুশিল্পের বাজার ও এর সমসাময়ীক পরিস্থিতিতে করিনীয় কি? এই প্রসঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু চিন্তা মাথায় ঘুরপাক করছে, ঢাকা কেন্দ্রিক দেশের আর্ট মার্কেটে শিল্পী ও গ্যলারীর অবস্থাটা আদতে কি? এই পর্যবেক্ষণ কি আমাদের আছে? স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তী পার হয়ে আসা এই আর্ট-সিনের মার্কেট বলতে যা বুঝায় তা শক্তপোক্ত কাঠামো নিয়ে গড়ে উঠেনি এখনো। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উদাসিনতা, এবং নীতি নির্ধারনী জায়গায় শিল্পকে ঠিক ভাবে বিবেচনা না করার কারনে দেশের জনসাধারণের টেক্সের টাকায় গড়ে উঠা এই শিল্প ইন্ডাস্ট্রির কোন সুফল রাস্ট্র বা জনগনের ভাগ্যে ফলে না দৃশ্যমান ভাবে। ইদানিং এই প্রোডাকশন চলে যায় ব্যক্তিগত পুঁজির বিপরীতে সস্তায় বেশী লাভের আশায় বিনিয়োগ কারীদের ভোগ হিসেবে। আর্টিস্ট কমিউনিটির একটা অতি ছোট অংশ এই পুজিপতিদের খাদ্যে রূপান্তরিত হয়ে আত্মস্লাঘায় ভোগেন আর বেশীরভাগ অংশ পথ খোঁজেন কি করে সেই রাস্তায় উঠে যাওয়া যায়, একবার পথ পেয়ে গেলে কেল্লা ফতে।

দেশের বর্তমান আর্ট মার্কেট পরিস্থিতি বুঝতে হলে আদতে আর্ট্মার্কেট বিষয়টা কি তা বুঝা জরুরী, আলোচ্য আর্ট-মার্কেট কাটামো তৈরি করে যেই সব মূল উপাদান তাদের গুরুত্বের ক্রমানুসারে লিখলে এভাবে লিখা যায়, শিল্পী, শিল্প সংগ্রাহক, গ্যালারী, আর্ট ডিলার, আর্ট মেলা, পেশাদার শিল্প-উপদেষ্টা।

আর্ট-মার্কেট শব্দটি আদতে একটা পরিবেশ বা ইকো-সিষ্টেমকে বুঝায় যেখানে অনেক শিল্পী নিজ নিজ চিন্তা ও দর্শন থেকে নিজের অরিজিনাল ভাষ্য উপস্থাপন করে এমন শিল্প কর্ম নিয়মিত সৃষ্টি করেন এবং বেচা বিক্রির জন্যে উম্মুক্ত রাখেন। যেখানে অনেক বিচিত্র আগ্রহ-সমৃদ্ধ শিল্পসংগ্রাহক গণ নিয়মিত ভাবে নিজেদের সংগ্রহ পরিচর্যা করেন। নতুন নতুন শিল্পকর্ম সংগ্রহ করেন। গ্যলারী গুলি সক্রিয় থাকে শিল্পীদের নানান মাত্রায় বিচিত্র আঙ্গিকে সংগ্রাহক ও শিল্প ভোক্তাদের সামনে তুলে ধরার কাজে, যোগাযোগ সক্রিয় রাখেন শিল্পী ও সংগ্রাহকের মধ্যে। শিল্পকে ঘিরে চলমান এই আর্থিক কর্মকান্ডের তৃতীয় স্তরে আরো বড় পরিসরে কাজ করে আর্ট ডিলার গণ। তারা বিভিন্ন গ্যালারি ও শিল্প গ্রাহকদের এবং শিল্পের অন্যান্য ভোক্তাদের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহের নিলাম /অকশন কিংবা কমিশন করেন, সংগ্রহের হাত বদলের জন্য নানামুখী তৎপরতা পরিচালনা করেন। আর্ট ডিলার, ও গ্যলারী গুলিকে নিজেদের ব্যবসা সুসংহত করতে ও ঝুঁকি এড়াতে আর্ট কিউরেটরদের সহায়তা নিতে হয়, আর্ট কিউরেটর গণ নিয়মিত এবং প্রফেশনাল এপ্রোচে সমসাময়িক শিল্পচর্চার বহুমুখী ট্রেন্ড ও ের চলমান আর্থিক ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির খবর রাখেন ও গবেষনা করেন, মার্কেটের চালিকা শক্তির একটি হল কিউরেটর, গ্যলারী ও আর্ট ডিলার গণ কিউরেটরদের উপর ভরসা করেন, বলা হয় বিশ্বের আর্ট মার্কেট চলে 3C ( Curator, Critic, Collector) এর জোগ-সাজসে। এই 3C এর একটি কিউরেটর। ডিলার, গ্যলারী এবং সংগ্রাহকদের পারস্পরিক বোঝাপড়া, ও লেনদেনের গতি সঞ্চারী ও প্রচার প্রসারতার বড় পরিসর হল শিল্প মেলা বা আর্ট-ফেয়ার। যেখানে অনেক বেশী সংখ্যক বিশেষায়ীত আর্ট প্রফেশনাল সংগ্রহক ও সংস্লিষ্ঠ পেশাদারদের সমাগম ঘটানো হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের নানান শিল্প প্রবনতা ও শিল্পপন্যের পসরা সাজিয়ে বসেন মেলায় অংশগ্রহনকারী গ্যালারী ও সংগ্রাহক সকল। এসব মেলা বা আর্টফেয়ার গুলিকে কেন্দ্র করে আর্ট্মার্কেটের বিশেষজ্ঞ গণ পরবর্তী বা ভবিষ্যতের আর্ট প্রবনতা গুলি নির্নয় করেন, এবং সেই অনুসারে তাদের নির্ধারিত গ্যলারী ও সংগ্রাহকদের লাভজনক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

মূলত ব্যাক্তি শিল্পীই আর্টমার্কেটের মূল উপজীব্য বিষয়। ব্যাক্তি শিল্পীর কাজের গুনগত মান, কাজের অন্তর্নিহীত দর্শন ও প্রকার প্রকরন মার্কেটের প্রসার ও পরিধি বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। শিল্পকর্মে সমসাময়ীক স্থানীয় ও বৈশ্বিক রাজনীতি, সমাজ ও বিশ্ব ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা, উপস্থাপনা, সমালোচনা কিংবা ভাষ্য স্থানীয় আর্ট মার্কেটের সাথে বৈশ্বিক আর্ট-মার্কেট কে যুক্ত করার সুযোগ বৃদ্ধি করে। ব্যাক্তি শিল্পীর উল্লেখযোগ্য মান ও বৈশিষ্ট্যের শিল্পকর্ম সৃষ্টির ধারা নিয়মিত থাকাটা একটা টেকশই আর্ট-মের্কেটের পুর্বশর্ত। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জায়গায় আমাদের আর্ট মার্কেট একাবারেই নাজুক পরিস্থিতিতে আছে। দেশের শিল্প শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গুলি বিশ্বের সমসাময়ীক শিল্পশিক্ষার ট্রেন্ড ফলো করেনা, এখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিল্পশিক্ষা ব্যবস্থার ভুত এখনো চেপে আছে অবিনাশি চরিত্র হিসেবে। চিন্তায় ও কাজে আমরা এখনো স্বাবলীল ও বৈশ্বিক করে তুলতে পারিনি আমাদের শিল্প-শিক্ষালয় গুলিকে। এই কারনে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যারা বের হয়ে আসেন তাদের বেশিরভাগেরই চর্চিত শিল্প কর্ম ও ভাবনা সমসাময়ীক বৈশ্বিক ট্রেন্ডের সাথে মানিয়ে নিতে পারেনা। তাদের মধ্যে যারা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানের এই সুনির্দিষ্ট ঘাটতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং ছাত্রাবস্থায় বেড়িয়ে আসার চেষ্টায় থাকেন তারা প্রফেশনাল জায়গায় কাজে এসে কিছুটা সুবিধা পান, কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই সুযোগ হয় না। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে ছাত্রাবস্থায় এই বুঝ বুঝে নিতে না পাড়লে আদতে বের হয়ে আসার পর এই ঘাটতি পুরন করে শিল্পকর্ম সৃজনে মনোনিবেশ করা ভীষণ দুরূহ হয়ে পরে। এসব কারনে বেশীরভাগ শিক্ষার্থী আর শিল্পচর্চার ইচ্ছা থাকলেও সৃজন কর্মে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন না। তবুও যারা চেষ্টা অব্যহত রাখেন তাদের ও সমসাময়িক প্রতিযোগিতা মূলক বৈশ্বিক শিল্প বাজারে প্রবেশ করার মত উপযুক্ত শিল্পকর্ম তৈরি করার জন্যে প্রতিষ্ঠানে ব্যায়ীত সময়ের চাইতে বেশী সময় ও সামর্থ্য ব্যবহার করতে হয়, যা বয়স ও পারিপার্শ্বিক সামাজিক পরিস্থিতির সাথে ভীষণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্থানীয় আর্ট-মার্কেট খুবই সীমিত আকারের হওয়াতে নতুন আগত শিল্পীদের এক্সেস পাওয়া খুবই কঠিন, ভালো কাজ করলেও অনেকের কাজ সমাদর পায় না। মার্কেটের গ্যলারী ও সংগ্রাহক শ্রেণী খুবই কম সংখ্যক হওয়াতে সবাই সবাইকে চেনে, জানে। তাই একধরনের পরিচয় ভিত্তিক প্রণোদনার চল আছে। শিল্পী ও শিল্পকর্মের নির্বাচনে গুনগত মান বিচার কেন্দ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপরে পরিচয়ভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়া কার্যকর থাকায় শুধু গুনবিচারের ভিত্তিতে কারো প্রবেশাধিকার তেমন দেখা যায় না এই রিজিট মার্কেটে । এক কথায় বললে, এখানকার শিল্প বাজারের ২য় স্তরে প্রফেশনাল আচরনের বিন্দুমাত্র চর্চাও গড়ে উঠেনি এখনো। তাই নবীন সম্ভাবনাময় শিল্পীর চলমান স্থানীয় বাজারে প্রবেশ করা ভীষণ দুরূহ একটা ব্যাপার। একারনে নতুন বা নবাগত শিল্পীদের অনেকের ইচ্ছে থাকা সত্বেও চর্চায় টিকে থাকা হয়ে উঠেনা।

গ্যালারি গুলির নিজেদের সুস্পষ্ট কোন চরিত্র কিংবা ব্যবসা পরিকল্পনাও দৃশ্যমান নয়। নাই সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তাড়া যা এদের বৈশ্বিক শিল্প বাজারের সাথে সম্পৃক্ত করবে। ভীষণ স্থবির গতির গ্যলারী তাদের আরো ধীরগতির প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কিছু কর্মকান্ডের ভিতরদিয়ে বছরব্যপী সক্রিয় থাকেন। নতুন নতুন শিল্প সংগ্রাহক বা শিল্পের স্থানীয় ভোক্তা সৃষ্টি করার বা নিজেদের বৈশ্বিক পরিমন্ডলে যুক্ত করার তেমন তাগাদা দেখা যায় না এসব গ্যলারীর কর্মকান্ডে।

এবার আসি শিল্প সংগ্রাহকদের প্রসঙ্গেঃ, যারা শিল্প সংগ্রহ করেন তাদের ও বেশির ভাগের মধ্যে এই সংগ্রহের পিছনে শিল্পের প্রতি অবুঝ ও নিরঙ্কুশ ভালবাসার বিপরীতে কোন উচ্চকাংখা থাকে না, থাকেনা নিজেদের সংগ্রহের বিপরীতে আর্ট্মার্কেটে তার তুল্যমুল্য বিচার ও সক্রিয় ব্যবসায়ীক তৎপরতার তাগাদা। ফলে তারা কয়েকজন শিল্পীর সাথে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন ও ক্রমাগত তাদের কাজে এডিক্টেড হয়ে পড়েন। এতে সামগ্রিক ভাবে আর্ট মার্কেটের বিকাশে কোন ভাল প্রভাব পড়ে না। মার্কেট এর প্রফেশনাল আবহাওয়া গড়ে না উঠার পিছনে এটি একটি বড় কারন। ফলে নতুন মুখ, নতুন ভাবনা, ও শিল্পকর্ম অবাধে এই মার্কেটে প্রবেশ করতে পারে না, এই ধারা অব্যহত থাকলে ঢাকাই আর্ট-মার্কেটের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ খুবই কম।


স্থানীয় আর্ট-মার্কেটের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে উঠতে পাড়ত বিশাল আকৃতির সরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। এর দেশব্যাপী বিশাল অবকাঠামো বিদ্যমান, সরকারী বিপুল লোকবল আছে। আছে সরকারী আর্থিক সহায়তা। এই বিশাল জাতীয় প্রতিষ্টানটির কাজে-কর্মে দেশের স্থানীয় আর্ট মার্কেট সম্প্রসারন কিংবা একে একটি পাকা-পোক্ত কাঠামোয় দাঁড় করানোর সচেতন আগ্রহ দৃশ্যমান নয়। কিন্তু তার পর ও এর কিছু প্রথায় পরিণত হওয়া আনুষ্টান অলখ্যে আর্ট-মার্কেটে প্রভাব রেখে চলছে। এর নিয়মিত নবীন শিল্পীদের প্রদর্শনী, জাতীয় চিত্র প্রদর্শনী, ও দ্বীবার্ষিক এশিয় চারুকলা প্রদর্শনী কোন সচেতন পরিকল্পনা ছাড়াই এখানকার অবকাটামো বিহীন আর্ট্মার্কেটে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এসব প্রদর্শনীর গুনগত মান, কিংবা এতে বৈশ্বিক ট্রেন্ডের ও শিল্পকর্মের উপস্থাপনার কোন ঝোঁক বা প্রচেষ্টা না থাকলে ও এর আদাখেচড়া উপস্থাপনার ফাঁকে ফোকড়ে অনেক নবীন শিল্পীর অগমন ঘটে চলছে, অনেকেই এই উদ্দেশ্যহীন জাতীয় প্রদর্শনী গুলির প্লাটফর্ম থেকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির সুযোগ পেয়েছেন। যদি এই একই সামর্থের ভিতরে এই সব ইভেন্টকে আর্টমার্কেট বিনির্মানের সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রার আওতায় রি-ডিজাইন করা যেত তবে তার ফল দাড়াতে পাড়ত অনেক বেশী কার্যকর ও লক্ষ্যভেদী। শিল্পকলা একাডেমীর বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোর ১০ ভাগ ও কোন কাজে আসেনা। কারন এর সামনে সেরকম কোন সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তাগাদা নাই। কিন্তু এই সরকারী প্রতিষ্ঠান এখনো সময়োপযোগী উদ্যোগ নিলে এর অবকাঠগামো ও জনবল এবং বিদ্যমান সরকারী সহায়তার সর্বোচ্চ কার্যকরি ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের আর্ট মার্কেটের পুর্ন-নিয়ন্ত্রন ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক খাতে বিপুল আর্থিক অবদান রাখার সম্মানে উন্নিত হতে পারে।

এই জাতীয় প্রতিষ্টানের একটি স্থাপনার সামান্য সহযোগীতা ব্যবহার করে সামদানী আর্টফাউন্ডেশন খুবই অল্প পুঁজিতে এদেশের শিল্পকর্মের জন্যে বিশ্ববাজার উন্মুক্ত করার গৌরব অর্জন করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু দেশ ব্যাপী বিশাল অবকাঠামো ও জনবল এবং বার্ষিক বাজেটের বিশাল একটা অব্যহত আর্থিক সহায়তা ব্যবহারের বিপরীতে এর কর্মকান্ডের বৈশ্বিক কোন প্রভাব দৃশ্যমান নয় কেন? তা কি এর সাথে জড়িত নিতীনির্ধারনী ব্যক্তিবর্গের এখনো ভাবার সময় হয়নি?

(চলবে—)

স্বপ্নগুলি ধূসর হয়ে উঠে ধীরে…

১৯৯৭-৯৯ এই বছর গুলিতে পতেঙ্গা আর আনোয়ারা থানার জুল্ধা, দেয়াং এর অনেক এলাকায় ঘুরেছি ছবি আঁকতে। আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের স্কাল্পচার এর রুমে এবং আরো কয়েকটি রুমে অযত্নে পরে ছিল কিছু প্যানেল, সাধারন কৌতূহলে একদিন একটা ধুলির আস্তর পরা প্যানেল নেকড়া দিয়ে পরিষ্কার করে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কি সুন্দর একটা ল্যান্ডস্কেপ, পরে এরকম আরো প্যানেল খুঁজে পরিষ্কার করে দেখে ছিলাম, লাইব্রেরি থেকে বই খুঁজে এই সব ছবির শিল্পী ও তাঁর প্র্যাকটিস সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব, মূলত ব্রিটিশ শিল্পী কন্সটেবল আমাকে পেয়ে বসেছিল। কন্সটেবল আর টার্নার এর ল্যান্ডস্কেপ দেখতাম সারাক্ষন। মাথার ভিতর কন্সটেবল ঘুরত সারাদিন, দৃশ্য খুঁজে বেড়াতাম যেখানে ই যেতাম। এই দুর্দান্ত ভাললাগা অনেক ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বেদনাকে পাশে রেখে আমাকে এগিয়ে দিয়েছিল বহুদূর। 

\"\"
ব্রিটিশ শিল্পী কন্সটেবলের ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং

এই ঘোরের মধ্যে কেটে গেছিল প্রায় ৩ বছর। এর মধ্যে অনার্স সেকেন্ডইয়ার ফাইনাল হয়ে গেছে। ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার সাথে রেজান্ট-পলিটিক্স কিছুটা বুঝতে পেরেছি, যা বুঝেছি তা রীতিমত ভয়াবহ। এখানে পড়া লেখার পাশাপাশি স্যারদের নানান লবিং, গ্রুপিং চালু আছে। কোন কোন প্রবীন স্যার নিজেদের পছন্দের ছাত্রছাত্রীদের নানান কায়দায় ফাস্টক্লাস পাইয়ে দিতে সক্ষম, এবং এর সাথে খাপ খাওয়াতে গেলে অনেক কিছুই করতে হয় ছাত্রছাত্রীদের যা এই পরিসরে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন দেখছিনা। তবে এইটা বুঝেছি এই রকম ভালো রেজাল্ট আমার চাই না। আমি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হতেও চাইনা কোন কালে। যা হতে চেয়েছি, যেই প্রবল ইচ্ছা ও আগ্রহ আমাকে সুদূর পতেঙ্গা থেকে এখানে তাড়িয়ে আনে প্রতিদিন সেই আকাঙ্ক্ষা দিনে দিনে ফিকে হতে থাকে। মনে হয় ভুল করেছি, ভর্তির আগে শ্রদ্দ্বেয়  কবি ও শিল্পী হাবিব আহসানের পরামর্শ আমার মনে পড়ে তখন। আমি তাঁর উপদেশ অগ্রাহ্য করে এখানে এসে আদতেই ভুল করেছি মনে হয়েছে বার বার। মনে হচ্ছিল আমার সময় ও সামর্থ্যের অপচয় করছি অহেতুক। তবুও শেষ না করে থামা যাবে না, কিন্তু এর থেকে মুক্তির পথ খুজতে হবে। 

\"\"
ব্রিটিশ শিল্পী জোসেফ মালর্ড উইলিয়াম টার্নারের ল্যান্ডস্কেপ

বন্ধু, সিনিয়রদের আড্ডায় এসব নিয়ে অনেক আলাপ তুলেছি, নিজে ভাবার চেষ্টা করেছি গভীর ভাবে। দেশের আর্তসামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক কালচার, সব কিছুই শিল্পচর্চার জন্যে বৈরী। এখানে ফাইন আর্টসের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখার শেষ করে শিল্পী হিসেবে নিজের চর্চা ধরে রাখতে পারেন না।  খেয়েল করে দেখলাম আমার আগের প্রায় ৭ ব্যচ থেকে পাশ করে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ৪/৫ জনের বেশী কাউকে নিয়মিত প্রাক্টিসে দেখছিনা। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হয়ে, বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ডিজাইনার হিসাবে কাজ করেন কিংবা অন্য পেশায় চলে যান। চারুকলা থেকে পড়ে ব্যাংকে চাকরি করেছেন এক বড়ভাই। এরকম সব ইনফরমেশন আসছিল আর ভাবছিলাম এই ইন্সটিটিউট এর আদতে উদ্দেশ্য কি? এর যেই কারিকুলাম আমরা পড়ছি, এ জয়নুল আবেদীনের ঢাকা আর্ট কলেজের কারিকুলাম, যা কিনা কলকাতা আর্ট কলেজে ব্রিটিশদের দ্বারা প্রবর্তিত, এর খুব বেশী পরিবর্তন বা আপডেট এখানে ঘটেনি। সমসাময়ীক শিল্পকলার যা খবরাখবর পত্রপত্রিকা ঘেঁটে পাই তাঁর সাথেও এই কারিকুলামের কোন সংগতি নাই। যা পড়ছি তাতে ডিজাইন ও খুব বেশী ভাইটাল না, যে পাশ করে ডিজাইনার হিসাবে কম্পিটিটিভ মার্কেটে খুব কাজে আসবে এই বিদ্যা। 

মূলত অনেকেই আন্দরকিল্লায় কিছু প্রেস টেকনিশিয়ানের কাছে গ্রাফিক ডিজাইন বেইজ সফটওয়্যার গুলি শিখে রাখছেন চারুকলায় পড়ালেখার পাশাপাশি, যাতে পাশ করে বের হয়ে একটা চাকরী পাওয়া যায় কোন এডফার্ম কিংবা প্রেসে। এই সব কাজের ফাকেই মাঝে মাঝে ছবি আঁকবেন, নয়তো শিক্ষকতা করবেন বা আর্ট স্কুল চালাবেন, ফাকফোকরে সময়করে ছবি আঁকবেন। মূলত ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে নেবেন বা নিয়েছেন এমন কাউকেই খুঁজে পাওয়া দুরূহ।  আর একটা বিষয় সামনে আসল, যারা আদতে এই দেশে শিল্পী হিসেবে নাম করেছেন এদের প্রায় সবাইই কোন না কোন ইন্সটিটিউট এর শিক্ষক, এর মানে দাঁড়ায় এই যে গড়পড়তায় তাঁরাই এই দেশে শিল্পী, যারা এই সব ডিপার্ট্মেন্টে ফাস্টক্লাস পেয়েছেন, আর সেই সুবাদে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছেন। শিক্ষকতা যে একটা আলাদা পেশা তা ইনাদের আর্টিস্ট পরিচয়ের সাথে মিলেমিশে একাকার। ইনাদের অনেকের শিল্পকর্ম দেখে আর শিক্ষকতার ধরন দেখে মনে খুব কষ্ট পেতাম। মনে হত কি দুর্ভাগা এই মানুষ গুলি, হতে পারলেন না শিক্ষক, না হতে পাড়লেন শিল্পী, ঝুলে আছেন যেন এক অমীমাংসিত সীমান্তে। এই সব অনুসন্ধান আর উপলব্ধি আমার উদ্দ্যমকে ধীরে ধীরে দমিয়ে দিতে থাকে। আমি চিন্তিত হয়ে উঠি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে। দক্ষতা কিংবা শৈল্পিক মন থাকলেই এই দেশে শিল্পী হওয়া যাবে না এই বাস্তবতা আমার বোধের রাজ্যে রীতিমত নতুন উৎপাত হিসেবে আবির্ভুত হল। আমি বিকল্প অনুসন্ধানে সময় বাড়ালাম। বেশ বুঝতে পারলাম আমার শিক্ষক কিংবা ডিজাইনার হবার যেহেতু কোন ইচ্ছা বা আগ্রহ নাই আমাকে অন্য কোন পথ বেছে নিতে হবে নিজের ভাললাগার বিষয়ের সাথে নিজেকে ধরে রাখতে।

(চলবে)

সময় এর ছিটেফোটা গল্পঃ

১৯৯৬-২০০০ এই সময় কালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় আমি অনার্স ফাইনাল দিয়ে উঠতে পারিনি সেশন জটের কারনে। কিন্তু নিজের ঐকান্তিক শ্রম ও চেষ্টায় নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা অব্যহত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, ছাত্র শিবিরের হানাহানিতে বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকত, তাই ক্লাস হতোনা। কিন্তু শহরে মনসুর-উল-করিম স্যারের দরজা খোলা থাকত সব সময়। আমি কর্নফুলীর তীরে সকাল সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াতাম ইজেল,বোর্ড, রঙ তুলিভরা ব্যাগ আর মনে প্রবল তাড়না নিয়ে। অনেক সময় সারাদিন দেয়াং পাহাড়ের নানান বাঁকে একা একা হেটেছি, কিন্তু সারা দিনে ছবি আঁকার মত কিছু খুজেই পাই নি। নানান রকম চিন্তা আর দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কোন কোন দিন ফুরিয়ে যেত। কখনো একই জায়গায় পরপর যেতাম, আঁকতাম নানান মাধ্যমে।

প্রকৃতির পাশাপাশি সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলতে, তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে বেশ ভালো লাগত। এমন অনেকবার হয়েছে যে, দেয়াং এর কোন গাছের নিচে ২-৩ দিন সকাল সন্ধ্যা ছবি আঁকছি। দুপুরে পাশের বাড়ির মুরুব্বি ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে আছে আজ দুপুরে উনার বাড়িতে খেতে হবে। কেউ বা ফ্লাক্সে গরম চা, জগ ভর্তি ঠান্ডা পানি আর ঘরে বানানো পিঠা নিয়ে হাজির হয়েছেন এক সাথে খাব এই আবদারে। আঁকছি নির্ভেজাল প্রকৃতি, আর জনমানুষের আগ্রহ আর মুগ্ধতার শেষ নাই। মাঝে মাঝে মনে হত যেন তাদেরই কাজ করছি আমি, তাই তারা এত আন্তরিক আর কৃতজ্ঞ আমার কাছে। তাদের অনেকে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার ইজেলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কখনো কখনো একবার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে নিজের কাজে গিয়েছে তো আবার এসে দেখেছে। এই সব মানুষ এই দেশের আমজনতা, এঁরা শিল্পের জটিল ও ক্রিটিকাল ভাষা জানে না। কিন্তু সরল মন আছে তাদের, তারা সহজ মন্তব্য করতে একদম ভাবে না। মুখের উপর বলে দিতে পারে তোমার আঁকা আকাশের রঙ ঠিকঠাক হয় নি, দুরের পাহাড়ে আরো নিল রঙ দিলে তবেই দেয়াং এর রূপ ফুটে উঠবে, কিংবা সাম্পান এর আঁকাটা ঠিক মত হয় নি। 

\"\"

এরকম ঘুরে ঘুরে যখন অনেক আঁকা হয়ে যেত তখন মনসুর উল করিম স্যারের বাসায় যেতাম যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে। স্যার কে কাজের বান্ডিল এগিয়ে দিলে ভীষণ খুশি হতেন এবং অনেক গল্প করতেন। নিজের ছাত্রজীবনের কত গল্প যে উনি শুনিয়েছিলেন তা এখন আর মনে করতে পারি না। শামিমা ভাবী ও আমাদের এই আড্ডা খুব পছন্দ করতেন। উনি কোন দিন খালিমুখে ফিরতে দেন নি আমাকে, সব সময় চা নাস্তা , কখনো কখনো দুপুরের খাবার স্যারের বাসায় খাওয়া হয়ে যেত ভাবীর আন্তরিক আমন্ত্রনে।

\"\"

চারুকলার ২য় বর্ষে ডিপার্ট্মেন্টের বার্ষীক প্রদর্শনীর জন্যে ছবি সাবমিট করার নোটিশ দেওয়া হয়েছে, আমি কিছু ছবি বাছাই করেছি, সবই জলরঙে করা প্রাকৃতিক দৃশ্য।আমার কাজ জমা ও করেছি। সহপাঠী ও বন্ধু সঞ্জয় তলাপাত্র ও কিছু কাজ ঠিক করেছে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে পাড়ছেনা কোন তিনটা জমা দিবে, তাই ক\’দিন ধরেই বলছিল ওর বাসায় যেতে।  আমার বাড়ি ফেরার তাড়া, আর পথের দুরত্ব ও যানবাহনের ভোগান্তির কারনে কয়েকদিন ধরে ওকে সময় দিয়েও যেতে পারিনি। কিন্তু এখন সময় ফুরিয়ে এসেছে কাজ জমা দিয়ে দিতেই হবে, কাল শেষ দিন কাজ জমা দেবার। তাই সঞ্জয়ের সাথে বটতলী স্টেশনে সকালে যখন দেখা হয়েছে, সঞ্জয় বলে রেখেছে ওর বাসায় যেতেই হবে আজ বিকেলে। সেদিন ৫.২০ এর ট্রেনে বটতলী নেমে সোজা সঞ্জয়ের পাথরঘটার বাসায় গেলাম রিকশায় চড়ে। গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে বসতেই আন্টি ( সঞ্জয়ের মা) কয়েক রকমের মিষ্টি ও কড়া-চা দিলেন। এই আপ্যায়ন এর আগে ও আমি যতবার সঞ্জয়ের বাসায় এসেছি সব বারই পেয়েছি। ওর বাসায় আসলেই ওর নতুন সংগ্রহ করা বই পত্র দেখতে দিত, আর দেখতাম ওর নতুন আঁকা ছবি ও স্কেচ। আমি সেগুলো উল্টে পালটে দেখছিলাম, সে কিছু দিন আগে কলকাতা গিয়ে বেশ কিছু নতুন বই এনেছে, চমৎকার কালেকশন। সে আমার জন্যে ও একটা বই এনেছে ছোট্ট পকেট বুক। অসাধারন ছাপা আর বাঁধাই, বইটি আমার প্রিয় শিল্পী ভ্যান গগ এর জীবন ও কর্ম নিয়ে, তবে তাঁর বিখ্যাত পেইন্টিং গুলির দারুন ছাপা মনমুগ্ধ করে। আমি উল্টে পাল্টে দেখলাম বইটি, সঞ্জয় আমার উপহার হিসেবে বই এর এক কোনায় সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখে দিয়েছে এক লাইনের শুভেচ্ছা বার্তা। অনেক আনন্দ পেলাম। সঞ্জয়ের এখানে আসলে আমার সময় বোধ উবে যেত, অনেক রাত হয়ে যেত আড্ডায়। সেদিন ও কখন যে ৯ টা বেজে গেছে টের পাইনি। ওর মা আমার জন্যে সরষে ইলিশ আর পোলাউ রান্না করেছেন, আমাকে অবশ্যই খেয়ে যেতে হবে। আমার ও অনেক ক্ষুধা আছে, সারা দিন তো ভার্সিটিতে হায়দারের দোকানের পাউরুটি কলা ডিম আর চা, বিকেলে মউর দোকানের সিঙ্গারা চা ছাড়া কিছুই খাওয়া হয় নি। সেইদিনের সরষে ইলিশএর স্বাদ আমি আগে কখনো পাইনি, ভর পেট খেয়ে, সঞ্জয়ের কাজ বেছে সারতে আমাদের ১০.৩০ বেজে গেল। আমার বাড়ি যেতে এখনো ১.৫ ঘন্টার পথ বাকি। বেড়িয়ে পড়লাম অনেক সুন্দর কিছু সময় কাটিয়ে। বাসের জন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল, রাত হয়ে যাওয়াতে বাস কমে গেছে, যাত্রীর চাপ ও কম বুঝা যাচ্ছে এই বাস অনেক দেরি করে পতেঙ্গা পৌঁছাবে। বাড়ি পৌছুলাম ১২ টার দিকে। গোসল, করে নামাজ ও ধ্যান করে ঘুমাতে ঘুমাতে দেড়টা বেজে গিয়েছিল।

\"\"

সকালে ঘুম ভাংতে অনেক দেরী হয়ে গেছে, টিউশনি মিস, ৮.২০ এর ট্রেন ধরার জন্যে অনেক তাড়াহুরো করলাম, কিন্তু টাইগারপাস ব্রিজ থেকে ট্রেন চলে যেতে দেখে টাইগার পাসেই নেমে গেলাম, তাড়াতাড়ি একটা রিকশা নিয়ে ঝাউতলা/আমতলি গেলেম, দেখি ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে। অনেক দৌড়ে শেষ বগীতে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারা গেলনা। ট্রেন চলে গেলে আমি আবার একটা টেম্পোতে উঠে টাইগার পাস হয়ে ২ নম্বর গেটে এসে বাসের ছাদে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে নামলাম। এই যুদ্ধ এক দিনের নয়, প্রায় মাসেই এমন দুর্গতিতে পড়তে হত ট্রেন ধরার জন্যে, কারন সে সময় আগ্রাবাদ এলাকায় এক বিশাল ড্রেনের কাজ শুরু হয়েছিল মেইন রোড ধরে। ফলে রাস্তায় অসহনীয় যান জট লেগেই থাকত, তাঁর উপরে ধুলাবালি তো আছেই।

যা হোক সেদিন আর দশটা দিনের মতই ডিপার্ট্মেন্টে পৌঁছে ক্লাসে ব্যাগ রেখে সঞ্জয়কে খুজলাম, কাল রাতে ওর বাসা থেকে যাবার সময় সঞ্জয় আমার জন্যে ট্রেনের সিট রাখার কথা। সে আজ প্রদর্শনীর জন্যে বাছাইকরা তিনটা ছবি জমা দিবে। কিন্তু তাঁকে দেখতে পেলাম না। আমি বারান্দায় অন্যদের খুঁজছিলাম। কিন্তু কোন কারনে এদিকে কেউ নাই। সিনিয়র কয়েকজন জটলা করে কি যেন আলাপ করছেন নাট্যকলার দিকে খালি জায়গাটাতে। সেখানে যেতেই, সামনের দিক থেকে একজন এসে জানাল আজকের ৮.২০ এর ট্রেন ছাড়ার আগে বটতলীতে একটা মারামারি হয়েছে। সেখানে চারুকলার একজন আহত হয়ে হাস্পাতালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু বলতে পাড়লনা কে আহত হয়েছে, সবাই চিন্তায় পড়ে গেল, আমি সবাইকে খুজতে লাগলাম আবার। আমাদের ক্লাসের একজন এসে জানাল আহত ছাত্র সঞ্জয় তলাপাত্র। ডিপার্ট্মেন্টে খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় নি, ডিপার্ট্মেন্টের পরিবেশ মুহুর্থে পাল্টে গেল। ছবি জমা দেওয়ার শেষ দিন হওয়াতে অনেকেই ছবি নিয়ে এসেছে, কিন্তু জমা দেওয়ার সেই মন কারো নেই আজ। সবাই সঞ্জয়ের আহত হবার ঘটনায় হতবিহ্ববল হয়ে পড়েছে। হাস্পাতাল থেকে খবর এসেছে সঞ্জয়ের অবস্থা ভালো নয়, তাঁর মাথার আঘাত গুরুতর এবং জীবন শঙ্কায় আছে। অনেক বড় আপুরা এই খবর সইতে পারেন নি, কান্নার আওয়াজ উঠেছে ডিপার্ট্মেন্টে। আমরা ফিরতি ট্রেনে, কেউ বেবি টেক্সিতে, বাসে চড়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলের নিউরোসার্জারী ইউনিটে পৌঁছেছি। হাস্পাতালের আবহাওয়া বেদনা বিধুর। বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে, আমি সঞ্জয়ের মাথার কাছে বসেছিলাম টানা ২ দিন। সে একটি বার ও চোখ খোলেনি, তাঁর কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। এক্স রে রিপোর্ট আসার পর জানা গেছে তাঁর মাথার খুলি ৩ ভাগ হয়ে গেছে, ব্রেন ইনজুরি হয়েছে। ডাক্তার কোন সিদ্ধান্ত দিতে পাড়ছেন না। ডিপার্ট্মেন্টের হেড আগামীকাল হাসপাতালে না আসা পর্যন্ত এই অবস্থায় থাকতে হবে,।সেলাইন, ব্লাড আর অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে, আদতে কোন চিকিৎসা শুরু করা যায়নি প্রথম দিন। পর দিন সকালে সিটি স্কেন করতে নিতে বলেছেন ডাক্তার, কিন্তু নড়াচড়া করতে হবে সাবধানে। এই অবস্থায় আরো একদিন কেটে যায়, কিন্তু আদতে চট্টগ্রাম মেডিকেল সঞ্জয়কে কোন চিকিৎসার আওতায় আনতে পারেনি। এই বিছানাতেই সঞ্জয় তাঁর জন্মদিন ২২ আগস্টে মৃত্যুবরন করে। মা বাবা ও তাঁর একমাত্র বোনের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে উঠে।

\"\"

আমি ২ দিন পড় বাড়ি গেলে মা বাবা ভীষণ রাগ করেন। কেননা আমি যে ২ দিন আগে বাড়িথেকে ভার্সিটি যাওয়ার জন্যে বের হয়ে গেছি আর ফিরি নি। এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র আহত হবার খবর টেলিভিশনে শুনেছেন তাঁরা। আমি কোন খবর না দিয়ে ২ দিন না আসাতে সবাই ভীষণ ভয় পেয়েছেন। তখন আজকের দিনের মত মোবাইল ফোন ছিলনা যে কাউকে ফোন করে খবর নেওয়া যায়। যা হোক মা বাবাকে বুঝিয়ে বললাম পুরো ঘটনা, পরে গোসল করে সামান্য খেয়ে আবার রওনা হই পাথারঘাটায় সঞ্জয়ের শেষ বিদায়ের সাথী হতে। সঞ্জয়কে চিতায় তুলে আমরা সবাই মন্সুর উল করিম স্যারের বাসায় এসে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে নানান পরিকল্পনা করি। কিন্তু পর দিন সকালে জানা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন সঞ্জয় কে তাদের কর্মী দাবী করে প্রতিবাদী কর্মসুচি দিয়েছে। এই নিয়ে অনেক রাজনীতি হল। শেষে মাস ২ যেতে যেতে বুঝলাম এই বিচার বা তদন্ত হবার কোন সুযোগ নাই। ঘটনার বিবরণ এবং রাজনৈতিক দাবী সমুহের মধ্যে বিপুল ফারাক। কে যে সত্যবয়ান দিচ্ছে তা নিয়ে আমি নিজেও কনফিউজড, কিন্তু সবাই এই ঘটনার জন্যে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবির কে দায়ী করে অনেক বক্তব্য দিয়েছে। ঘটনার বর্ননায় জানা গেছে সেদিন বটতলী স্টেশনে দলীয় লিফলেট বিতরন কে কেন্দ্র করে ছাত্র শিবির ও ছাত্রলীগের সদস্যদের মধ্যে কয়েকদফা ধাওয়া পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সঞ্জয় তলাপাত্র সে সময় ও বটতলী পৌঁছেনাই। গত রাতের আড্ডার কারনে সে ও দেরিতে উঠেছে ঘুম থেকে উঠেছে, তাই তাঁর স্টেশনে পৌছুতে দেরী হয়েছে। সে ট্রেন ছেড়ে যাবার সামান্য আগে বটতলী স্টেশনে পৌঁছে, প্লাটফর্মের দিকে দৌড় দেয় ট্রেন ধরার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে চলতে থাকা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার কারনে একদল ছাত্র কে ভিতরদিক থেকে আরেকদল ছাত্র চেলা কাঠ ও লাঠি নিয়ে তাড়া করে আনছিল, সঞ্জয় প্লাটফর্মে ঢুকেই এই দৃশ্য দেখে উল্টো দৌড় দিলে সেখানে রাখা একটা মাইক্রো বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু তাঁর মুখে স্টাইল করে রাখা দাড়ির কারনে বা অন্য কোন কারনে বা কোন কারন ছাড়াই শুধুমাত্র পালাতে চেষ্টা করা একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবেই তাড়া করে আসা লাঠি হাতের ছাত্রদের দলটি সঞ্জয়ের উপর হামলা করে। তাঁকে চেলা কাঠ আর লাঠি দিয়ে এলোপাথাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত করে স্টেশনের গেটে ফেলে রেখে চলে যায়। এদিকে একই সময় ট্রেন ছেড়ে যায় স্টেশন, ফলে সেখানে আর কোন ছাত্রছাত্রী ছিল না। যার ছিল তাঁরা ও দ্রুত স্টেশন ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু সঞ্জয় আহত অবস্থায় অনেকক্ষণ পড়ে থাকে স্টেশনে। এক রিকশাচালক পরে সঞ্জয়কে তুলে নিয়ে অন্য এক পথচারীর সহায়তায় মেডিকেলে ভর্তি করে। মেডিকেল থেকে সঞ্জয়ের পরিবার ও ডিপার্ট্মেন্টে এই খবর ছড়িয়ে পরে। আমি এক জন বন্ধু হারাই। মা বাবা বোন টি তাদের প্রাণের ধন সঞ্জয়কে হারিয়ে ফেলে চিরতরে। কোন অপরাধ নয় শুধুমাত্র পড়তে এসে সঞ্জয় দুষ্ট রাজনীতির স্বীকারে পরিণত হয়েছিল। অনেকেই তাঁর লাশ নিয়ে ও রাজনীতি করার চেষ্টা করেছেন, ভীষণ দুঃখজনক এই স্মৃতি আমরা আজীবন বয়ে বেড়াব। সঞ্জয় হত্যার কোন তদন্ত হয় নি, বিচার হয়নি আজো।

(চলবে)

https://sanjoytalapatra.blogspot.com/